আজ শহীদ জিয়ার সময়কে খুব মনে পড়ে: ইনাম আহমদ চৌধুরী

ভাবতে অবাক লাগে, তিন দশকের অধিক কাল পরেও ‘শহীদ জিয়া ও তাঁর আদর্শ’ স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র সুরক্ষার ক্ষেত্রে কী আশ্চর্য শক্তিশালী ও উদ্দীপক ভূমিকা পালন করছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের যে গৌরবোজ্জ্বল চেতনা নিয়ে বাংলাদেশের জন্ম, তাকে রক্ষা ও শক্তিমান করে তোলার জন্য সর্বাধিক প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের শক্ত ভিত্তি রচনা—প্রয়োজন ছিল দেশ গঠনের কাজে জনগণের সার্বিক সম্পৃক্ততাবোধের সঞ্চার—প্রয়োজন ছিল নতজানু না হয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও সীমান্তে সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রেখে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে সৌভ্রাতৃত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার এ বিশ্বাসকে যে শুধু অনুধাবন ও সংজ্ঞায়িত করেছিলেন তা নয়, সে লক্ষ্যগুলো প্রতিষ্ঠা ও অর্জনের মানসে তাঁর ছিল আমৃত্যু প্রয়াস। তাই তিনি আজও সকৃতজ্ঞ দেশবাসীর সশ্রদ্ধ স্মরণে চির জাগরূক।

ব্রিটেনের বিশ্বখ্যাত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ‘আয়রন লেডি’ নামে খ্যাত ব্যারোনেস মার্গারেট থ্যাচার তাঁর মৃত্যুর আগে অনুরোধ রেখে গিয়েছিলেন যেন তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় স্কটল্যান্ডের দেশপ্রেমিক কবি রবার্ট বার্নসের একটি গান গীত হয়। সেটি ছিল, ‘আই প্লেজ টু  ইউ, মাই কান্ট্রি’। অর্থাৎ ‘হে আমার দেশ, আমি তোমার কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ হলাম’। থ্যাচার বিতর্কিত, কিন্তু তাঁর নিখাদ দেশপ্রেম সম্পর্কে দ্বিমতের অবকাশ নেই। বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশ ও জাতির কাছে সেভাবেই অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলেন, তাঁর প্রিয় গান ছিল, ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ/জীবন বাংলাদেশ, আমার মরণ বাংলাদেশ’। এ গানটি তাঁকে উদ্বুদ্ধ করত। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে যেন সমগ্র জাতিও এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের সেবায় এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর পছন্দের এই গভীর দেশপ্রেমের গানটি মনে পড়ে। ইচ্ছা করে জাতির বর্তমান পরম অস্বস্তিকর মুহূর্তে সবাই এককণ্ঠ হয়ে এ গানটিই গাই।

বিশ্বের সফল ও বরেণ্য রাষ্ট্রনায়ক অনেকেই রয়েছেন। কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যে সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দরিদ্র ও অনগ্রসর দেশ, যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় দোদুল্যমান, তাতে স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে তাকে স্থাপন করে, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তি সুদৃঢ় করে, উন্নয়নের রাজপথে তাকে চলমান করিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া ছাড়া বিশ্বের ইতিহাসে খুব বেশি কারও আছে বলে আমার জানা নেই।

বিস্ময়ের কথা, রাজনীতিতে সে সময় অনভিজ্ঞ এক তরুণ সামরিক কর্মকর্তা কী অদম্য সাহস, অপরাজেয় মনোবল ও অসীম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে নেতার  নামে দেন দিকনির্দেশনামূলক স্বাধীনতার অটল ও ‌নির্ভিক ঘোষণা। আবার সফল মুক্তিসংগ্রামের মধ্য-সত্তরের মর্মান্তিক পটভূমির জানাজা কাঁধে নিয়ে এক অস্থির অার্থসামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কান্ডারী হয়ে জাতিকে এক বিপর্যয়ের মুখ থেকে রক্ষা করে তাকে সুদৃঢ় বুনিয়াদের ওপর স্থাপন করেন। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের প্রথম দিকে ১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভারতের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় রাষ্ট্রপতি জিয়ার কৃতিত্ব ও সম্ভাবনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসাবাণী উচ্চারণ করতে গিয়ে একটি ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরেন। জিয়ার উদ্দেশে তিনি বলেন,

‘Your position is already assured in the annals of the history of your country as a brave freedom fighter who was the first to declare the independence of Bangladesh.’

অর্থাৎ ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা প্রথম দিয়ে তিনি যেভাবে সাহসী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন, তাতে বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর নাম চির সংরক্ষিত থাকবে।’

রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদতের পর ১৯৮১ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট আয়োজিত এক সভায় তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে কমনওয়েলথের তদানীন্তন মহাসচিব স্যার শ্রীদাথ সুরেন্দ্রনাথ রামফল (Shridath Surendranath Ramphal) বলেছিলেন,

“রাষ্ট্রপতি জিয়া বাংলাদেশে শুধু একদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠা করেননি, এ উন্নয়নকর্মী দেশকে সার্বিক উন্নয়নের রাজপথে পরিচালিত করেছিলেন।’ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে ‘সার্ক’-এর মাধ্যমে ঐক্যের বন্ধনে গ্রথিত করা ছিল তাঁর এক স্বপ্ন। রাষ্ট্রপতি জিয়ার অকালমৃত্যুতে তাঁর দেশ একজন দক্ষ, সৎ সংগঠক ও সফল রাষ্ট্রনায়ককেই শুধু হারাল না, দক্ষিণ এশিয়া হারাল এক দূরদর্শী স্বাপ্নিক অগ্রপথিককে, উন্নয়নশীল দেশ-গোষ্ঠী হারাল এক সৃষ্টিধর্মী নেতা, কমনওয়েলথ হারাল সৌভ্রাতৃত্ব ও সহযোগিতায় বিশ্বাসী এক মহান ব্যক্তিত্বকে।”

মার্লবরো হাউসে অনুষ্ঠিত এ সভায় সেক্রেটারি জেনারেল  রামফলের সেই জলদগম্ভীর কণ্ঠে প্রদত্ত শোকবাণী কী শ্রদ্ধা, কী সম্ভ্রম, কী দুঃখবোধ নিয়ে সমবেত কমনওয়েলথ প্রতিনিধিরা শুনেছিলেন! শোকাহত সে মুহূর্তে উপস্থিত আমারও মহা গর্ববোধ হয়েছিল, আমার দেশের প্রয়াত নেতার প্রতি বিশ্ববাসীর শ্রদ্ধাঞ্জলি দেখে।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনা মনে পড়ে। জেদ্দায় ৫৫ সদস্য রাষ্ট্র সমন্বিত ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে গিয়েছিলাম সদস্যরাষ্ট্র মালির রাজধানী বামাকোতে। দেশটির তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট কোনারে কথায় কথায় বলেন,

‘আপনি তো বাংলাদেশি। বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। উন্নয়নকামী দেশগুলোর অগ্রগতির জন্য তাঁর ছিল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। আল-কুদসের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে করেছিলেন আন্তরিক প্রচেষ্টা। তাঁর অবর্তমানে ওআইসি ও এলডিসি দেশগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তারা হারিয়েছে এক অন্যতম যোগ্য নেতা।’

অবাক বিস্ময়ে শুনছিলাম এক মরহুম রাষ্ট্রপতির প্রতি আরেক দেশের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের শোকাপ্লুত শ্রদ্ধা নিবেদন, বহু বছরের ব্যবধানে বহুদূরের এক দেশে। প্রেসিডেন্ট কোনারে আরও বললেন,

‘জিয়াউর রহমান স্মরণে আমরা রাজধানীর একটি প্রধান সড়কের নাম করেছি। গিয়ে দেখে আসুন।’

দেখলাম, শহরের প্রশস্ততম রাজপথ কিং ফাহাদ সরণির অব্যবহিত পরেই অ্যাভিনিউ জিয়াউর রহমান। দুই দিকে বৃক্ষসারির মধ্যে প্রসারিত দীর্ঘ রাজপথ। মনে পড়ল, তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায়ও দেখেছিলাম জিয়ার নামে আরেকটি সরণি। ওই সুদূরে এক ভ্রমণকারী বাংলাদেশির অন্তর গৌরবে ভরে দিলেন জান্নাতবাসী জিয়া। গিনির সেকু তুরে, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, ভুটানের রাজা ওয়াং চুক, আরও বহু নেতার কাছে শহীদ জিয়াউর রহমান সম্পর্কে উষ্ণ প্রশস্তি শুনেছি। এসব উক্তি রাষ্ট্রাচারের প্রয়োজনতাড়িত ছিল না, ছিল অন্তর থেকে উৎসারিত আবেগঘন অভিব্যক্তি। এটা অনস্বীকার্য, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিগৃহীত ও দুর্বল দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যবন্ধন সৃষ্টি করে তাদের ন্যায্য দাবি আদায়, দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানকল্পে ঐকমত্যের সন্ধান, দুরাচারমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, সৎ ও সাধু জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা নিয়ে জাতিকে উজ্জীবিত করা—এসব ছিল জিয়ার লক্ষণীয় প্রচেষ্টা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। অতি স্বল্প সময়ের মধ্যেই একটি বিভ্রান্ত জাতিকে যেন তিনি এক জিয়নকাঠির মায়াবি ছোঁয়ায় আত্মবিশ্বাসী, প্রাণবন্ত ও সক্রিয় করে তুলেছিলেন।

আজ যখন দেশে সত্য ও ন্যায় সর্বক্ষণ পরাভূত হচ্ছে প্রলোভন ও পরাক্রমের প্রতিকারহীন অপরাধে, আজ যখন আইনের শাসন হয়ে পড়েছে এক বিস্মৃত প্রায় জীবনধারা, আজ যখন সরকারি কাজকর্ম দুর্নীতির গভীরতম কন্দরে নিমজ্জিত, আজ যখন স্বৈরাচারী কায়দায় গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার সভা-সমাবেশ হচ্ছে নিষিদ্ধ, আজ যখন বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভাবে থমকে আছে—তখন শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়কে খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে তাঁর উদ্দীপনাময় নেতৃত্ব ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, তাঁর সফল ও সবল রাষ্ট্র পরিচালনা, জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশ গড়ার তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল না নতজানু ও দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। বিশ্বমঞ্চে তখন আমরা দাঁড়িয়েছিলাম মাথা উঁচু করে। সার্বভৌমত্ব ছিল সুরক্ষিত।

আজ যখন আমরা জাতীয় জীবনে একটি সাংঘর্ষিক অবস্থার মুখোমুখি, যখন অর্থনীতি, শিক্ষাঙ্গন ও আইনশৃঙ্খলা বিপর্যস্ত, যখন সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা নির্বাসিত, তখন অবশ্যই জিয়াউর রহমান ও তাঁর নেতৃত্বের কথা মনে পড়ে। বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচনের জন্য সমঝোতামূলক পরিবেশে গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া নির্ধারিত হোক, এটা আমাদের আশা। রাষ্ট্রপতি জিয়ার সার্থক উত্তরসূরি বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া এবং আগামীর নেতা তরুণ তারেক রহমান শহীদ জিয়াউর রহমানের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই সংকটাবস্থায় বিরোধী দল ও জাতিকে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে উত্তরণের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, এটাই আজ আমাদের ঐকান্তিক কামনা ও বিশ্বাস।

  • লেখক অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা।
Torna su