ষষ্ঠ কাউন্সিল

ষষ্ঠ কাউন্সিল

 

বিসমিল্লাহির রহমানুর রাহিম

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ষষ্ঠ কাউন্সিল অধিবেশনের

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাননীয় সভাপতি,

দেশনেত্রী চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া,

সম্মানিত অতিথিবৃন্দ,

মঞ্চে উপবিষ্ট জাতীয়তাবাদী দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ,

কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ,

জাতীয়তাবাদী দলের কাউন্সিলর ও ডেলিগেটবৃন্দ,

বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও কর্মীবৃন্দ,

সহযোদ্ধা ভাই ও বোনেরা,

সুধী মন্ডলী,

আসসালামুআলাইকুম,

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের উদ্বোধনী অধিবেশনে আমি আমার নিজের এবং দলের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ভাবে স্বাগত জানাচ্ছি।

আপনারা আমার সংগ্রামী অভিবাদন গ্রহণ করুন।

আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি স্বাধীনতার ঘোষক, বহু দলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তক, আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এর নাম, স্মরণ করছি সেইসব বীর শহীদানদের কথা যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

আমি আরও স্মরণ করছি, সেইসব শহীদদের যারা বাংলাদেশের মানুষের জন্য সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে আত্মত্যাগ করেছেন। আমি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছি আমাদের দলের সেই সব নেতা-কর্মীদের যারা ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে বর্তমান অগণতান্ত্রিক, কর্তৃত্বপরায়ণ ও ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে আত্মদান করেছেন।

আমি স্মরণ করছি ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ আমাদের অনেক নেতা ও কর্মীদের কথা, যারা গুমের শিকার হয়ে কোথায় আছেন আমরা জানি না। আমি আরও স্মরণ করছি, আমাদের দলের ও ২০ দলীয় জোটের হাজার হাজার নেতা-কর্মীদের, যারা জেল জুলুম, হুলিয়া ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলার মুখেও দৃঢ় চিত্তে শহীদ জিয়ার প্রদর্শিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের পতাকাকে উর্ধ্বে তুলে ধরে রেখেছেন।

আমি স্মরণ করছি দলের প্রয়াত মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের নাম, যিনি দুঃসময়ে দৃঢ় চিত্তে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আমি আরও স্মরণ করতে চাই রাজপথের লড়াকু সৈনিক, দলের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু সহ কয়েক জন নেতা-কর্মীদের কথা যারা দীর্ঘকাল কারা নির্যাতন ভোগ করে অকালে প্রাণ দিয়েছেন।

সুধী মন্ডলী, সহযোদ্ধা ভাই ও বোনেরা,

আজ আমি পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করতে চাই আমাদের দলের নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পরে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পতাকা হাতে তুলে নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, নগরে-বন্দরে চারণ কবির মত গান গেয়ে জাগিয়ে তুলেছেন বাংলাদেশের মানুষকে। আজও জীবনের অনেক পথ পেরিয়ে গণতন্ত্রের এই চারণ কবি গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে চলেছেন। হারিয়েছেন তার দীর্ঘদিনের স্মৃতি বিজড়িত বাসগৃহ, হারিয়েছেন তার পরম আদরের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে, বিচ্ছিন্ন হয়েছেন বড় ছেলে তারেক রহমান সহ পরিবারের ঘনিষ্টজনদের কাছ থেকে। কিন্তু মনোবল হারাননি, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নও হননি। অটল পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের

সেনা-সমর্থিত ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীনের সরকারের আমলে আমাদের নেত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে সকল প্রকার নির্যাতন সহ্য করেছেন, দেশবাসীর মনে জুগিয়েছেন আশার আলো। ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীন সরকারের আমলে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীরা অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। দেশনেত্রী দীর্ঘ ১ বছর ৬ মাস ৪ দিন কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন। তাঁর আপোসহীন অবস্থানের কারণেই সেদিনের স্বৈরশাসকরা ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার নামে দেশকে বিরাজনীতিকীকরণের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছিল। ২০০৮ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর দেশবাসী আশা করেছিল, ক্ষমতায় আসীন আওয়ামী লীগ দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে। বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি’র নেতা ও কর্মীদের প্রতি অন্যায় আচরণ করবে না।

অথচ অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করলাম, ক্ষমতায় আসীন হয়েই বিএনপি’র বিরুদ্ধে প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ সরকার। সেনা সমর্থিত সরকারের আমলে অন্যায়ভাবে দায়ের করা নিজেদের মামলাগুলো প্রত্যাহার করলেও তারা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান সহ আমাদের নেতা-কর্মীদের নামে দায়ের করা কোন মামলাই প্রত্যাহার করল না, বরং নতুন নতুন মিথ্যা মামলা দায়ের করল।

বিগত বছরগুলোতে আমাদের প্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে নিগৃহীত হয়েছেন তা স্বৈরশাসনের ইতিহাসেও এক কলঙ্কময় অধ্যায় হিসাবে উল্লেখিত হবে। দেশনেত্রীর ওপর গত সাত বছরেরও বেশী সময়ে গণতন্ত্রের দাবীদার বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার যে নির্যাতন চালিয়েছে এবং হয়রানি করেছে একদিন এদেশের মানুষ তার জবাব দেবে।

একটি কথা আজ এখানে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই। বেগম জিয়া এদেশের একমাত্র নেত্রী যিনি সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দেশে পার্লামেন্টারী পদ্ধতির গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন, সেনাসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন করেছেন এবং এখনও তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আপোষহীন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে খালেদা জিয়া মানেই গণতন্ত্র, গণতন্ত্র মানেই খালেদা জিয়া।

সুধী মন্ডলী, সহযোদ্ধা ভাই ও বোনেরা,

আপনারা জানেন, আমাদের দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারপার্সন তারেক রহমান সেনা সমর্থিত সরকারের আমলে কি ধরণের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শারীরিকভাবে প্রায় পঙ্গু করে দেওয়ার পরেও তিনি মাথা নত করেননি, আপোষ করে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন নি। একের পর এক মামলা দিয়ে তার জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলা হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের জন্য চ্যালেঞ্জ বলেই তাকে দেশে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু শাসক চক্র জানে না, যেদিন বিজয়ীর বেশে তারেক রহমান দেশে ফিরবেন সেদিন কোটি মানুষের ভালবাসা, সমর্থন তাকে গণতন্ত্রের এক বিজয়ী সেনাপতি হিসাবেই প্রতিষ্ঠিত করবে।

সহযোদ্ধা ভাই ও বোনেরা,

আপনারা জানেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং আগামীর নেতা তারেক রহমানের চরিত্র হননের জন্য এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। ক্ষমতাসীনরা ভাল করেই জানে, এই তিনটি শুধু নাম নয়, বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাংখার প্রতীক। একারণেই আওয়ামী লীগ সরকার ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাজনীতির চর্চা করছে। কিন্তু আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, বিএনপি ঘৃণার রাজনীতিতে বিশ^াস করে না, বিএনপি বিশ^াস করে ঘৃণা বিদ্বেষ মানুষের পতন ডেকে আনে, ধ্বংস করে দেয় সকল ঔদ্ধত্যকে, যেমনটি ঘটেছে হিটলার-মুসোলিনীর ক্ষেত্রে।

 

 

ভাই ও বোনেরা,

বিগত কয়েক বছরে সরকারের নজিরবিহীন দমননীতির কারণে আমাদের দলের প্রায় ৫০২ জন শহীদ হয়েছেন, হয় পুলিশের গুলিতে অথবা সরকারি দলের সন্ত্রাসীদের হাতে। অপহৃত হয়েছেন প্রায় ২২৩ জন। গুরুতর আহত হয়েছেন প্রায় ৪,০০০ জন। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় ১৮,০০০ জন। মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে প্রায় ২২,০০০ এবং আসামী করা হয়েছে প্রায় ৪,৩০,০০০ জনকে। প্রকাশ্যে গুলি করে ক্রসফায়ারের নাটক সাজানো হয়েছে, হাজার হাজার অজ্ঞাত নামা আসামী দিয়ে জুলুম চালিয়েছে নিরীহ গ্রামবাসীদের উপর। রাজপথে শান্তিপূর্ণ মিছিলে সরাসরি গুলি চালিয়েছে। অতি সম্প্রতি মিথ্যা মামলায় প্রায় ৫০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের সাজা দেওয়া হয়েছে। সরকার একটি ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন পেশার সদস্যদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই মিথ্যা অজুহাতে জেলে আটকে রাখা হয়েছে বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য জনাব মির্জা আব্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান জনাব আব্দুস সালাম পিন্টু, প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী জনাব লুৎফুজ্জামান বাবর সহ অসংখ্য নেতা-কর্মী ছাড়াও দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক জনাব মাহমুদুর রহমান, সাংবাদিক নেতা জনাব শওকত মাহমুদ, একুশে টিভির প্রাক্তন চেয়ারম্যান জনাব আবদুস সালাম, নাগরিক ঐকের আহ্বায়ক জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না সহ ভিন্নমতের আরো অনেককে।

এই পরিস্থিতির অবসানের জন্য এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা বার বার আলোচনার আহ্বান জানিয়েছি। সরকার কোনো সাড়া দেয় নি। ফলে অবিশ^াস, অনিশ্চয়তা, অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত জনগণের জীবনকে দুঃসহ করে তুলেছে।

সুধী মন্ডলী, সহযোদ্ধা ভাই ও বোনেরা,

বর্তমান নির্বাচন কমিশন দলীয় প্রতিষ্ঠানের মতই কাজ করছে। ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন, উপজেলা পৌর নির্বাচন, চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, বর্তমান সরকারের অধীনে এই নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু ও অবাধ হতে পারে না। নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্ব ও অযোগ্যতা নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলেছে। আমরা এই নির্বাচন কমিশন ভেঙ্গে দিয়ে জাতীয় ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং দলীয় প্রভাব মুক্ত নির্বাচন কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছি।

সুধী মন্ডলী, সহযোদ্ধা ভাই ও বোনেরা,

বাংলাদেশে মানবাধিকার আজ চরমভাবে লংঘিত। বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড, গুম, খুন এখন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। বিনা বিচারে দীর্ঘকাল আটক রাখা এখন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা সহ অন্যান্য লোম হর্ষক ঘটনা আইন শৃংখলা বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। নারী নির্যাতন, শিশু হত্যা বাংলাদেশে এখন উদ্বেগের বিষয়। নিরপেক্ষ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ওপর সরকারি চাপ প্রচন্ড ভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে আমরা এটাও লক্ষ্য করছি, মত প্রকাশের, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রয়োগের সুযোগ ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দৈনিক আমার দেশ, চ্যানেল ওয়ান, ইসলামিক টিভি, দিগন্ত টেলিভিশন। আমরা এই পরিস্থিতির অবসান চাই।

সুধী মন্ডলী, সহযোদ্ধা ভাই ও বোনেরা,

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ চরম সংকটের সম্মুখীন। সরকার ভ্রান্ত তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। প্রকৃতপক্ষে অর্থনীতি এখন অন্তঃসার শূন্য হয়ে পড়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সীমাহীন জালিয়াতি, লুন্ঠন, শেয়ার বাজারে লুট, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ৮ শত কোটি টাকা চুরির ঘটনা, জালিয়াতির মাধ্যমে এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরি মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। পোষাক শিল্প সংকুচিত হচ্ছে, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আশংকাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। কৃষক কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে। আর্ন্তজাতিক বাজারে জালানী তেলের মূল্য হ্রাস পেলেও বাংলাদেশে হ্রাস করা হয় নি। বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক দুর্নীতির কারণে সামগ্রিক অর্থনীতির উপরে যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। কোথাও কোনো জবাবদিহিতা নেই। উন্নয়ন গণতন্ত্রের বিকল্প হতে পারে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য টেকসই গণতন্ত্র অপরিহার্য। আমরা সেই গণতন্ত্রের কথাই বলছি, সেই কারণেই সংগ্রাম করছি।

সুধী মন্ডলী, সহযোদ্ধা ভাই ও বোনেরা,

বিগত দশকে বিশ^ রাজনীতিতে ব্যাপক পট পরিবর্তন ঘটেছে। দুটি বিষয় বিশ^ রাজনীতিকে তুমুলভাবে নাড়া দিয়েছে। এর একটি হচ্ছে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের উত্থান অন্যটি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। ঘটেছে নতুন সমীকরণ। মহাশক্তিধর দেশগুলোর প্রভাব বলয়ে পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত। আমাদেও মতো দুর্বল রাষ্ট্রগুলো এই প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারছে না।

সম্প্রতি বাংলাদেশে কিছু কিছু সন্ত্রাসী ঘটনা জনমনে এবং বিশে^ উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে জঙ্গী উপস্থিতির কথা জোরে শোরে বলা হচ্ছে। বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা, বিদেশি হত্যা, শিয়া মসজিদ ও হোসেনি দালানে হামলা, হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে হামলা ও পুরোহিত হত্যা, ব্লগার হত্যা ক্রমেই সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলেছে। অথচ বর্তমান সরকার বিরোধী মত ও দলকে দমন করবার লক্ষ্যে মূল দায়ী ব্যক্তি বা সংগঠনকে খুজে বের না করে বিরোধী দলের উপর দায় চাপাচ্ছে। ফলে জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা এ বিষয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আমাদের দলের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ মোকাবেলা করার জন্যে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন এবং এই বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন। বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গীদের উপস্থিতির আশংকা ব্যক্ত করছেন কিন্তু সরকার তা অস্বীকার করে সুষ্ঠু তদন্ত করছে না এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই সংকট মোকাবেলার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।

আমরা বিশ^াস করি মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ক্ষেত্র সংকুচিত হলে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদ নির্মূল করা সম্ভব হবে না, উপরন্তু তাকে উসকে দিতে সাহায্য করবে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক দলগুলোকে সুস্থ রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

সুধী মন্ডলী, সহযোদ্ধা ভাই ও বোনেরা,

পৃথিবীর যে অঞ্চলে আমাদের বাস সেখানে দেশে দেশে পারস্পরিক যোগাযোগের বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তেমনি প্রভাব বিস্তারের জন্য বড় দেশগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিনিয়ত আমাদের উদ্বিগ্ন করে। আমরা লক্ষ্য করছি আগামী দিনে ভারত মহাসাগরে আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের প্রতিযোগিতা বেশ বড় হয়ে দেখা দেবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কভাবে পথ চলতে হবে। যে কোনো পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনায় আমরা বিশ^াস করি। বিশ^ায়ণের নামে কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায় বিশ্বাস করি না।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রবর্তিত সার্ক চেতনার আলোকে আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক আরও উন্নত করতে চাই। সাম্প্রতিক অতীতে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রতিবেশী ভারতকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি এখনও যেসব সমস্যা অমীমাংসিত রয়ে গেছে আমরা তার দ্রুত গ্রহণযোগ্য সমাধান চাই। আমরা আশা করি, তিস্তা সহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগির বিষয়টির খুব দ্রুত সমাধান হবে। একই সঙ্গে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা সহ অন্য যেসব অমীমাংসিত বিষয় আছে সেগুলোর গ্রহণযোগ্য সমাধানের ব্যাপারে ভারত সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে আমরা মনে করি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পদ ভাগাভাগি ও পাকিস্তানী নাগরিকদের সে দেশে প্রত্যার্বতন সহ যেসব অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে সেসবের দ্রুত সমাধান হওয়া উচিৎ।

সুধী মন্ডলী, সহযোদ্ধা ভাই ও বোনেরা,

বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। বিএনপি হিংসা, বিদ্বেষ, অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কার্যক্রমে বিশ^াস করে না। অথচ, আজ আমরা লক্ষ্য করছি বর্তমান সরকারের আমলে দ্বিমত পোষণকারী ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক অধিকার ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ এখন প্রায় তিরোহিত।

এ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে হলে আমাদের কয়েকটি বিষয়ের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্রথমত, সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় দলকে সংগঠিত করতে হবে।  নিজেদের মধ্যে সংহতি, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে আরও অনেক উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। আমরা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে আন্দোলনের কথা বলি তার কর্মকৌশল হবে : সংগঠন-আন্দোলন-নির্বাচন। এ কারণেই দলের মধ্যে সরকারের অনুপ্রবেশকারীদের সম্পর্কে সর্তক থাকতে হবে। এরাই গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এই সংগ্রামের পথটি কন্টকাকীর্ণ। আওয়ামী লীগ এমন একটি রাজনৈতিক দল যাদের ইতিহাসে পরমত সহিষ্ণুতা, বিরোধিতা সহ্য করা বলে কিছু নেই। আজ থেকে ছয় দশক আগে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী যখন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন শেষে পল্টন ময়দানে জনসভা করতে গিয়েছিলেন তখন সেখানে হামলা চালিয়েছিল সশস্ত্র আওয়ামী গুন্ডারা। ভিন্নমত দমন ও ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েমের লক্ষ্যেই আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন চাপিয়ে দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের বিশ^াস ও কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কোনো উপস্থিতি নেই। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বনি¤œ পর্যায়ে এ দলের প্রতিটি কর্মী মনে করে এ দেশটি তাদের এবং ক্ষমতা চিরস্থায়ী। গত কয়েক বছরে এদের কার্যক্রমে এমন কোন পেশার মানুষ নেই যারা অত্যাচারিত, অপমানিত হন নি।

একটি কথা এখানে স্পষ্ট করে বলতে চাই - বিএনপি রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধার দল। এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার বাস্তবায়ণে বিএনপি অনেক বেশি সংকল্পবদ্ধ, অনেক বেশি উদার রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী দল।

আমরা একটি গণতান্ত্রিক দল এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মাধ্যমেই বর্তমানের কর্তৃত্ববাদী সরকারকে পরাজিত করতে চাই। আমাদের এই সংগ্রামে আমরা সবাইকে সঙ্গে পেতে চাই। সেজন্য, আমাদের বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সে ঐক্যের ভিত্তি হবে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতিষ্ঠা, সুশাসন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা। এই সংগ্রামে দল, মত, ধর্ম, বর্ণের উর্ধ্বে উঠে আমরা এমন একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চাই যা বাংলাদেশের জন্য এক সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করবে। আমরা বাংলাদেশের মালিকানা বাংলাদেশের জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই।

সুধী মন্ডলী, সহযোদ্ধা ভাই ও বোনেরা,

অনেক ত্যাগ ও কষ্ট সহ্য করে আপনারা আজকের কাউন্সিল অধিবেশনকে সফল করেছেন। আপনাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ। বিভিন্ন বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও আদর্শের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আমরা এই কাউন্সিল অধিবেশনের আয়োজন করতে পেরেছি। সরকারের জেল, জুলুম ও রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে আমরা আমাদের অধিকারের আন্দোলন, জনগণের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাব।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের এটা উপলব্ধি করা উচিত যে, দেশের মাত্র এক তৃতীয়াংশ মানুষের সমর্থন নিয়ে তারা ক্ষমতায় টিকে আছেন। যে কোন সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও সকলের অংশগ্রহণ মূলক নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি ঘটবে। এ কারণেই তারা জাতীয় নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সাহস দেখায় না। তারা বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ বন্ধ করে দিয়ে নির্বাচন সম্পর্কে মানুষকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে- যাতে একদলীয় শাসন কায়েম করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলনের যে ঐতিহ্য তাই ক্ষমতাসীনদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেবে।

সুধী মন্ডলী, সহযোদ্ধা ভাই ও বোনেরা,

জাতির এই ক্রান্তিকালে গণতন্ত্রকে ফিরে পেতে গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সকল দেশপ্রেমিক, গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির সমন্বয়ে ইস্পাত দৃঢ় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। দলের প্রতিষ্ঠাতা, গণতন্ত্রের পুনপ্রবর্তক, শহীদ জিয়ার অনুসৃত বাংলাদেশ নির্মাণের নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত।

আমরা এক গণতান্ত্রিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ করতে চাই। নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে চাই সেই বাংলাদেশ নির্মাণের সৈনিক হিসাবে। সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে দারিদ্র দূর করে সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এক জ্ঞানভিত্তিক সমৃদ্ধ সমাজ গড়তে চাই। এমন এক জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে চাই যারা মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ^াসী, কর্ম উদ্দীপনায় উদ্দীপ্ত এবং বিশ^ায়ণের আগ্রাসনের মোকাবেলায় ও প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হবার আত্মপ্রত্যয়ে উজ্জ্বীবিত।

আসুন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে সেই সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী দল হিসাবে গড়ে তুলি। আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের লক্ষ্য।

আল্লাহ হাফেজ।

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দবাদ।

Torna su