২১শে আগষ্ট বোমা হামলা মামলায় প্রকৃত অপরাধীকে বাদ দিয়ে তারেক রহমানকে ফাঁসানো অপচেষ্টা চলছে : রুহুল কবির রিজভী

'২১শে আগষ্ট বোমা হামলা মামলায় প্রকৃত অপশক্তিকে পর্দার অন্তরালে ঢেকে রেখে বিচারিক কার্যক্রম চলাকালীন অবস্থায় চার্জশিট ফিরিয়ে এনে সম্পূরক চার্জশিট তৈরী করে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের নাম জড়ানো হয়েছে মনের ঝাল মেটাতে' বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনের সম্পূর্ণ বক্তব্য নিম্নরূপ।

সুপ্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
আস্সালামু আলাইকুম। সবাইকে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা কৃতজ্ঞতা।

বিশ^ব্যাপী দেশে দেশে জাতীয়তাবাদী নেতারাই থাকে আগ্রাসী শক্তির টার্গেট। জাতীয়তাবাদের প্রতীক যারা, তাদের ধ্বংস করার জন্য চালানো হয় নানামূখী চক্রান্ত। অপশক্তিকে পরাস্ত করতে না পারলে তাদের চক্রান্তের ফলশ্রুতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ, দেশের মানুষ ও জাতীয়তাবাদী নেতারা। ২১শে আগষ্ট বোমা হামলা মামলায় প্রকৃত অপশক্তিকে পর্দার অন্তরালে ঢেকে রেখে বিচারিক কার্যক্রম চলাকালীন অবস্থায় চার্জশিট ফিরিয়ে এনে সম্পূরক চার্জশিট তৈরী করে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের নাম জড়ানো হয়েছে মনের ঝাল মেটাতে। এজন্য আইনী প্রক্রিয়াকে হাতের মুঠোয় নিয়ে কুটিল চক্রান্তের মাধ্যমে জনাব তারেক রহমানকে ভিকটিম করা হয়েছে। সমগ্র ঘটনাটি এ সময়ের কোন এক কাশিমবাজার কুঠিতে চক্রান্তজাল বুনেছে চক্রান্তকারীরা।
জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রধান কান্ডারী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মিথ্যা মামলায় কারাগারে বন্দী, কয়েক মাস পরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা। অধিকারহারা জনগণ একটি জোরালো আন্দোলনের জন্য অগ্নিগর্ভ হয়ে আছে। এমনিতে সারাদেশে ঝাঁকে ঝাঁকে গায়েবী মামলায় এক অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। তার ওপর দেশজুড়ে বাসাবাড়ীতে চলছে বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে খোঁজার ধুম। মধ্যযুগের ‘ডাইনী শিকারের’ মতো পাইকারী হারে গ্রেফতারের শিকার করা হচ্ছে নেতাকর্মীদের। ফাঁপা উন্নয়নের জিগির তুলে জনগণের অর্থের লুটপাট, বেপরোয়া গুম-খুন আর রক্তপাতের দমবন্ধ করা পরিস্থিতির সুযোগের সদব্যবহার করতেই ২১শে আগষ্ট বোমা হামলার রায়ের দিন ধার্য্য করা হয়েছে।

২১শে আগষ্ট ২০০৪ সমাবেশ নিয়ে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনার বক্তব্য-

সভা অনুষ্ঠানের পূর্বদিন (২০-০৮-২০০৪) থেকে ২২ নভেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত সোয়া তিন বছর শেখ হাসিনা কোন অনুষ্ঠানেই বলেননি যে, ‘পুলিশ সেদিন তাঁর সভা করার অনুমতি দেয়নি।
কিন্তু ২০-০৮-২০১২ ইং এ একুশে টিভিতে বলেন, ‘২০-০৮-২০০৪ তারিখে রাতে পুলিশ অনুমতি দিয়েছিল, আবার দু’দিন পর ২২-০৮-২০১২ আমাদের সময় ও দৈনিক জনকন্ঠে বলেন, ‘বৃটিশ হাই কমিশনারের ওপর হামলার প্রতিবাদে মুক্তাঙ্গনে সভা করার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু আমাদের অনুমতি দেয়া হয়নি। শেষ রাতে অনুমতি দেয়া হয়। কেন তা দেয়া হয়েছিল ? আওয়ামী লীগ তো সভা করার পরিকল্পনা বাদই দিয়েছিল।’

বন্ধুরা, উনি যদি সমাবেশের পরিকল্পনা বাদই দিয়ে থাকেন, তাহলে দলের পক্ষ থেকে কোন স্টেটমেন্ট দেননি কেন ? দুপুর ১টা পর্যন্ত মুক্তাঙ্গনে আওয়ামী লীগের সমাবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকার পর কেন তিনি সমাবেশ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে নিয়ে গেলেন ? সমাবেশে পুলিশের অনুমতি নিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য অসঙ্গতিপূণ ও রহস্যজনক।
ঘটনা পরবর্তী বিএনপি সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাসমূহ-
২৩-০৮-২০০৪ ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদ ঃ মর্মান্তিক এই ঘটনার সংবাদ প্রাপ্তির পর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সমবেদনা জানিয়ে সুধাসদনে আসতে চেয়ে ফোন করেছিলেন, কিন্তু ইতিবাচক সাড়া পাননি।

২৩-০৮-২০০৪ যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদ ঃ শেখ হাসিনার সাড়া না পেয়ে বেগম খালেদা জিয়া সিএমএইচ-এ গুরুতর আহত আইভি রহমান ও মে: জে: (অবঃ) তারেক সিদ্দিকীকে দেখতে যেয়ে তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসার নির্দেশ দেন।
২৩-০৮-২০০৪ প্রথম আলো-তে প্রকাশিত সংবাদ ঃ গুরুত্বপূর্ণ বোমা হামলার এই খবর প্রচার না করার জন্য বিটিভি’র নির্বাহী প্রযোজক মোস্তাক জহিরকে অপসারণসহ অন্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
২৩-০৮-২০০৪ ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদ ঃ ঘটনার পরদিনই বেগম জিয়া তিন দফা মিটিং করে অপরাধীদের ধরা ও আইনের আওতায় এনে সবধরণের আইনী ব্যবস্থার নির্দেশ দেন, এগুলো তিনি নিজেই মনিটরিং করেন। এ বিষয়ে সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতার আহবান কামনা করে প্রকাশ্যে বিবৃতিও দেন।

বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই-কেও ঘটনাস্থলে আনয়নের ব্যবস্থা করেন বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু শেখ হাসিনা এফবিআই-কে কোন সহযোগিতা করেননি।
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশ এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের কারণেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে এ বিষয়ে রাষ্ট্রের সকল গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন শৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধানদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এই মর্মান্তিক ঘটনার সংবাদদাতাকে কোটি টাকা পুরস্কারের ঘোষনা দেয়া হয়।
তৎকালীন বিরোধী দলের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবীর প্রতি সম্মান দেখিয়েই এই ঘটনা অনুসন্ধানকল্পে হাইকোর্টের একজন সিনিয়র বিচারপতি’র নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করে ৩ সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

যে প্রতিবেদন রিপোর্ট এ সংক্রান্তে নিয়মিত মামলার তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে বিবেচনায় তখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। যা এখন প্রকাশে আর কোন বাধা নেই। কিন্তু বর্তমান সরকার তা করছে না।

কোন ক্লু-লেস ফৌজদারী ঘটনা তদন্তের মূল সূত্র ও ভিত্তিই যেখানে হচ্ছে-সংঘটিত ঘটনার বেনিফিশিয়ারি কে বা কারা, আর ক্ষতিগ্রস্ত কে বা কারা, তা নিরুপণের মাধ্যমে তদন্তে কার্যে অগ্রসর হওয়া। উপরিবর্ণিত দালিলিক সাক্ষ্য-প্রমানের সূত্র ধরে যদি তা বিবেচনা করা হয়, তাহলে এই ঘটনার ক্ষতিগ্রস্ত যে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জোট সরকার, আর বেনিফিশিয়ারি হবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; সেটি অনুধাবনের জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন হয় না।

সুতরাং সামগ্রিক ঘটনা বিশ্লেষণে বিএনপি’র ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা ও আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভুতি সৃষ্টির জন্যই এই বোমা হামলা করা হয়েছে বলেও জনগণ মনে করে এবং এই মামলার রায়ের তারিখ আসন্ন নির্বাচনের পূর্বে নির্ধারণ করাটাও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। শেখ হাসিনার আমলে বিচারের রায় কি হবে তা জনগণ ভালভাবেই জানে। নির্দোষ বেগম খালেদা জিয়াকে কুটকৌশল করে কিভাবে কারাগারে বন্দী রাখা হয়েছে তাও জনগণ জানে। যেদেশে প্রধান বিচারপতিকে বন্দুকের নলের মুখে দেশ ছাড়তে হয়, যেদেশে প্রধান বিচারপতি বিচার পান না, সেখানে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে কি বিচার হবে সেটি নিয়ে জনগণ চিন্তিত নয়। কারণ ২১শে আগষ্ট বোমা হামলা রায় ঘোষনার আগেই প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা বলেছেন-এই রায়ের পর নাকি বিএনপি আরও বিপদে পড়বে। তার মানে এটা সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, ২১শে আগষ্টের রায় কি তাহলে সরকারের ডিকটেশনে লেখা হচ্ছে ? বন্ধুরা, সেদিন বেশী দুরে নয়, গণতন্ত্র পূণ:রুদ্ধার হবেই। আর গণতন্ত্র পূণ:রুদ্ধার হলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। সুতরাং যত ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল দিয়ে ঘিরে রাখুন না কেন, একতরফা নির্বাচন আর এদেশে জনগণ হতে দেবে না।

বন্ধুরা,
গতকাল থেকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার ঃ
ভোলা জেলায় ৪ জন নেতাকর্মী গ্রেফতার।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলাধীন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপি’র আহবায়ক অধ্যাপক কুতুব উদ্দিন, যুবদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক নাজিম উদ্দিন, যুবদলের সদস্য বাবুল আলম, যুবদলের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক জামাল উদ্দিন, যুবদলের সদস্য ফজলুল হক, যুবদল কমী শাহজাহান শিকদার, মোঃ ফোরকান, চট্টগ্রাম উত্তর ছাত্রদলের কর্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্মী আলী নুর তালুকদার মনি, আব্দুল মামুন, মোঃ ফারুক, মোঃ আব্দুল্লাহ, আবু তৈয়ব, মাজহারুল ইসলাম এবং রফিকুল ইসলাম (মঙ্গল)সহ ১৫ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

সুনামগঞ্জ জেলায় ৪ জন নেতাকর্মী গ্রেফতার।
নোয়াখালী জেলাধীন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভা ছাত্রদলের সভাপতি সুমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ, এছাড়া নোয়াখালী পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হাসান নোমানের হাতে অবৈধ অস্ত্র দিয়ে তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ফাহিম নামে ছাত্রদলের কর্মী তাকে দেখতে গেলে তাকেও থানার মধ্যে গ্রেফতার করা হয়।

ঠাকুরগাঁওয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে ১ জনকে।
মুন্সিগঞ্জ জেলায় এজাহার নামীয় ৬২ জন নেতাকর্মীসহ ২০০ অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে গায়েবী মামলা দিয়েছে পুলিশ।
এছাড়াও হবিগঞ্জ, কুমিল্লা এবং নরসিংদীসহ সারাদেশে বাড়ি বাড়ি পুলিশী তাল্লাশী এবং বিভিন্নভাবে পুলিশী হয়রানী চলছে।
আমি দলের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে তাদের নি:শর্ত মুক্তির জোর দাবী করছি।
আল্লাহ হাফেজ।

Torna su